ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামালাকে কেন্দ্র করে মধ্যেপ্রাচ্যজুড়ে বিদ্যমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণে দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলা করতে অর্থনীতিবিদরা যে কোনো পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখাসহ নীতি সুদের হার আপাতত না কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি তারা বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির পথ খোঁজার পরামর্শও দিয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে ছোট ও মাঝারি শিল্পের প্রতি বিশেষ নজর রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি আয়বর্ধক কর্মসূচি নেওয়ার প্রতি জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে কোনোক্রমেই যাতে মূল্যস্ফীতির হার আর ঊর্ধ্বমুখী না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সভার আয়োজন করে। ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সভায় দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক ও দেশীয়ভাবে সৃষ্ট নেতিবাচক পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা যায় সেসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খান প্রমুখ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে চার ডেপুটি গভর্নর ও শীর্ষ নির্বাহীরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় গভর্নর বলেন, তিনি পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করবেন। রাজনৈতিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ব্যাংকগুলোকেও রাজনৈতিক চাপে কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে বলেছেন। ব্যাংক খাত পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ পেশাদারত্ব বজায় রাখা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে কেউ পেশাদারত্ব ভেঙে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ড করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা করে। আত্মরক্ষার জন্য ইরানও পালটা হামলা চালিয়েছে। এরপর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চলমান রয়েছে। তবে সর্বশেষ জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের মার্কিন ঘাঁটি থেকে ইরানে আর হামলা না চালালে ইরানও এসব দেশে হামলা চালাবে না। গতকাল ইরানের পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস দেওয়া হয়।
বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা বিদ্যমান পরিস্থিতিতে যে কোনো মূল্যে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, বৈশ্বিক সংকট বাড়লেও রিজার্ভ থাকলে জরুরি পণ্য আমদানি করা যাবে।
এজন্য রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। এর পাশাপাশি তারা ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতেও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন। এজন্য এখন থেকেই আমদানি নিয়ন্ত্রণ করাসহ জরুরি পণ্য ছাড়া বিলাসী পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
বৈঠকে তারা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদের হার কমিয়ে এখন অর্থনীতিতে ঝুঁকি সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। বরং নীতি সুদের হার না কমিয়ে অপরিবর্তিত রাখার পরামর্শ দেন। এতে ঋণের সুদের হারও অপরিবর্তিত থাকবে। ফলে চড়া সুদের কারণে আমদানিও নিয়ন্ত্রিত হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তখন সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। তারা আরও বলেন, এখন সুদের হার কমালে আমদানি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির হারও বেড়ে যেতে পারে। যেটি হয়েছে ২০২২ সালের বৈশ্বিক মন্দার সময়ে। ওই সময়ে চড়া দামে রেকর্ড পরিমাণ আমদানির ফলে বিদেশ থেকে দেশে মূল্যস্ফীতি আমদানি করা হয়েছে। যার প্রভাবে দেশের ভেতরেও এ হার বেড়ে ডাবল ডিজিটে চলে যায়। এখন সাড়ে ৮ শতাংশে নেমে এলেও তা সহনীয় নয়। এ হার আরও কমাতে হবে। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবের কারণে এ হার না কমানো সম্ভব হলেও যাতে আর না বাড়ে সেদিকে নজর দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলেছেন, সংকট কতটা প্রকট হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। এই সংকট এড়ানোরও কোনো সুযোগ নেই। এটি মোকাবিলা করতে হবে। সেজন্য সঠিক ও কৌশলী পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের ভেতরের পরিস্থিতি যতটুকু সম্ভব স্বাভাবিক রাখা যায়। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পে বেশি কর্মসংস্থান রয়েছে। এ খাতকে ধরে রাখতে হবে। পাশাপাশি বড় শিল্পকেও রক্ষার কৌশল নিতে হবে। কৃষি উৎপাদনের দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। যাতে খাদ্য পণ্য আমদানি করতে না হয়। এ সময় দেশ থেকে খাদ্যপণ্য রপ্তানি আরও বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। এতে দামও বেশি পাওয়া যাবে, বৈদেশিক মুদ্রারও আয় হবে।
তারা সতর্ক করে বলেন, এখন অর্থনীতিকে প্রসারিত করার সময় নয়, বরং টিকে থাকার কৌশল নিতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া যাবে। তখন বিনিয়োগও বাড়বে, পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, জ্বালানি উপকরণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে বিকল্প উৎসের খোঁজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও জ্বালানির আরও উৎস রয়েছে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেও এখনই দেশে না বাড়ানোর পরামর্শ দেন তারা। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে প্রায় সবকিছুর দামই বাড়বে। তখন মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যাবে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখতে তারা হুন্ডির বিরুদ্ধে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানির নতুন বাজার খোঁজা ও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দিতে বলেন। বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তারা একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন। ওই কমিটি থেকে অর্থনীতিবিদদের হালনাগাদ পরিস্থিতি জানানোর কথা বলা হয়, যাতে তারাও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারেন। যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলার জন্য অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য বৈঠকে গভর্নরকে ধন্যবাদ জানানো হয়।
Leave a Reply