বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে কথা বলা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে। দেশজুড়ে দুই হাজারের বেশি সরকারি ও বেসরকারি কলেজের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণ করে। সংখ্যার বিচারে এই কলেজব্যবস্থাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় অংশীদার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বৃহৎ ব্যবস্থায় শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে।
বাংলাদেশ একটি তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সের, এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ উচ্চশিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ করে তুলতে চায়। এই তরুণশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে তা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে। ফলে দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের সরকারি কলেজগুলো গ্রামীণ ও অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তাই কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন এখন শুধু শিক্ষানীতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঐতিহাসিকভাবে কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা নিয়ে জনমনে কিছু অভিযোগ রয়েছে। অনেক কলেজে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়, নিয়মিত পাঠদান হয় না, গবেষণামূলক কার্যক্রম সীমিত, লাইব্রেরির ব্যবহার কম এবং শিক্ষক–শিক্ষার্থীর মধ্যে কার্যকর একাডেমিক যোগাযোগও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। এসব সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুরুত্ব দিলে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার মান ধীরে ধীরে উন্নত করা সম্ভব।
শিক্ষক–শিক্ষার্থীর সম্পর্ক: শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু
যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক। এই সম্পর্ক যত সুগঠিত হবে, শিখন প্রক্রিয়াও তত কার্যকর হবে। শিক্ষাবিদদের মতে, একজন শিক্ষক কেবল জ্ঞান প্রদানকারী নন; তিনি একজন পথপ্রদর্শক, পরামর্শদাতা এবং অনুপ্রেরণার উৎস। কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত একাডেমিক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা যদি শিক্ষকের সঙ্গে মুক্তভাবে আলোচনা করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে, তাহলে তাদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বিকশিত হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক কলেজে শিক্ষক–শিক্ষার্থীর মধ্যে এই যোগাযোগ সীমিত। এই দূরত্ব কমিয়ে একটি সহযোগিতামূলক ও আন্তরিক একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।
শিক্ষকদের উপস্থিতি ও একাডেমিক দায়বদ্ধতা
কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং একাডেমিক দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে ক্লাস নেওয়া, পাঠ্যসূচি অনুসরণ করা, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা এবং তাদের উৎসাহিত করা একজন শিক্ষকের মৌলিক দায়িত্ব। তবে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত ক্লাস পরিচালনায় নানা বাধা থাকে। শিক্ষকসংখ্যা সীমিত, অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, আবার বছরের বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা চলতে থাকায় অনেক কলেজে স্বাভাবিক শ্রেণিকাজ ব্যাহত হয়। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহও কমে যেতে পারে। তাই শিক্ষকদের নিয়মিত ক্লাস নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাডেমিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও দায়িত্ববোধ
শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষার্থীদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে। অনেক কলেজে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকে না। অনেকেই পরীক্ষার আগে স্বল্প সময়ের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার চেষ্টা করে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়; বরং জ্ঞান অর্জন, বিশ্লেষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চিন্তাশক্তির বিকাশ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি তাদের একাডেমিক সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই কলেজগুলোতে উপস্থিতি নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার পরিবেশ
কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে এখনো একমুখী বক্তৃতাভিত্তিক পাঠদান প্রচলিত রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা শিখন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে না। এর পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। নিয়মিত সেমিনার, উপস্থাপনা, দলীয় আলোচনা এবং গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম চালু করা গেলে শিক্ষার্থীরা আরও আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনায় অংশগ্রহণ করবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বিশ্লেষণধর্মী ও সৃজনশীল শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
লাইব্রেরি ও গবেষণা সংস্কৃতি
উন্নত শিক্ষাব্যবস্থায় লাইব্রেরিকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু অনেক কলেজে লাইব্রেরি থাকলেও তার ব্যবহার খুবই সীমিত। আধুনিক লাইব্রেরি ব্যবস্থা, ডিজিটাল রিসোর্স এবং অনলাইন জার্নালের সুযোগ বৃদ্ধি করা গেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার আগ্রহ বাড়তে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহার
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উপাদান। অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ব্যবহারের মাধ্যমে পাঠদান আরও কার্যকর করা সম্ভব। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক ধারণা ও ব্যবহারিক দক্ষতা গড়ে তোলাও প্রয়োজন। এতে তারা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে আরও দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য দক্ষ মানবসম্পদ অপরিহার্য। সেই মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো কলেজ পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা। যদি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নিয়মিত উপস্থিতি, দায়বদ্ধতা এবং সক্রিয় একাডেমিক অংশগ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায়, তাহলে কলেজগুলো সত্যিকার অর্থেই জ্ঞানচর্চার প্রাণবন্ত কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার মান উন্নয়ন কেবল শিক্ষাক্ষেত্রের উন্নয়ন নয়; বরং দেশের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক :
মো: রায়হান উদ্দিন
সহকারী অধ্যাপক (অর্থনীতি)
বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ, সিলেট।
Leave a Reply